একুশ আমাদের লাইট হাউজ–এ্যাড. খন্দকার মজিবর রহমান

0
20

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রয়ারি ছিলো বাংলাদেশের প্রথম গণচেতনার সুসংগঠিত সফল গণঅভূত্থান ও পরবর্তীকালে শাসক চক্রের বিরুদ্ধে স্বাধীকার আন্দোলনের প্রথম বলিষ্ট পদক্ষেপ। তাই একুশ আমাদের কিংসুক, গণআন্দোলনের বহ্নিশিখা।

পৃথিবীতে খুব কম জাতির আছে যারা ভাষার দাবিতে অকাতরে প্রাণ বিষর্জন দেয়। এই পৃথিবীর অন্য কোন জাতির এই মহেন্দ্র ভাষা ভিত্তিক স্বাধীকার আন্দোলনের ইতিহাস নেই। তৎকালীন পাকিস্তান রাস্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহ স্বয়ং বাঙালি তথা পূর্ব পাকিস্তানিদের তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্ছিত করার ষড়যন্ত্র শুরু করেন। রাস্ট্র ভাষা প্রশ্নেই প্রথম সংঘাতের সূচনা করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

তিনি ১৯৪৮ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় এক সমাবেশে প্রথম উচ্চারণ করেন উর্দু কেবল মাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। তার এই বিবেকহীন উক্তি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেহীন স্বৈরাচারী আচরণের দ্বারা তিনি আগামী রাজনৈতিক সংকটের বীজ বপন করেন। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চের জনসভা এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার স্বপক্ষে নিজের জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখেন। তাৎক্ষনিক ভাবেই ছাত্র সমাজের পক্ষে জোরালো প্রতিবাদের ঝড় উঠে।

বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যা গরিষ্ট মানুষের মাতৃভাষা হওয়া সত্বেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করে কেবলমাত্র ৬ ভাগ মানুষের ভাষাকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠণ করা হয়্। ভাষার দাবিতে সংগ্রামের ধারাবাহিক পথ পরিক্রমা শুরু হয়। অত:পর ১৯৫২ সনের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার এক জনসভায় পাকিস্তানের তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খাজা নাজিম উদ্দিন উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা করেন। শুরু হয় ভাষার দাবিতে তৎকালী পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে হরতাল, ধর্মঘট ও ছাত্র বিক্ষোভ।

১১ ফেব্রয়ারি সারাদেশে প্রস্তুতি দিবস, ২১ ফেব্রয়ারি সারা পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। সরকার ২০ ফেব্রয়ারি থেকে সারা পূর্ব বাংলায় ১৪৪ ধারা জারি করে। ২১ ফেব্রæয়ারি ঢাকার ছাত্ররা সংগঠিত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ ও সেনাবাহিনী গুলি চালায়। বহু ছাত্রজনতা হতাহত হয়। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ অজ¯্র ছাত্র জনতা। ভাষা শহীদের তালিকায় আজও তাদের নাম জ্বল করে জ্বলছে।

আমি পূর্বেই বলেছি ভাষা আন্দোলন ছিলো আমাদের বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম সোপান। উৎস থেকে উন্মেষের পর একটি বহতা নদী যেমন সর্পিল পথে হেটে যায় বহুদুর, অত:পর আত্মহুতি দেয় সাগরে। ঠিক তেমনি মহান একুশের পথ ধরে আসে ১৯৫৪ সনের যুক্ত ফ্রন্ট। নির্বাচনে ভেসে যায় জিন্নাহ’র সাধের পাকিস্তানী রাষ্ট্রের ভীত, ধ্বংস হয়ে যায় মুসলিম লীগের গণভিত্তি। জন্ম নেয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তীতে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারক, বাহক আওয়ামী লীগের জন্ম এদেশের এই জাতির জীবনে মহেন্দ্রক্ষণ। আন্দোলনের ধারাবাহিক পথ পরিক্রমায় ১৯৬২-এর ছাত্র আন্দোলন, ৬৬’র ৬-দফা ভিত্তিক স্বাধীকার আন্দোলন সৃষ্টি, স্বাধীনতার দাবিতে গণজাগরণ শুরু হয়।

১৯৬৯’এর গণঅভূত্থান। স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ১৯৭০ এর নির্বাচন যুদ্ধ। এবং ৭১’এর মহান মুক্তিযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বরের রাঙা প্রভাত একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন জাতির মুক্তির ঘোষণার দিন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ১৯৫২এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে রক্তাক্ত অর্জন দিয়ে শুরু। ১৯৭১ সনের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মাধ্যমে সফল প্রাপ্তি। ১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কারাগারে ভাষা আন্দোলনের অগ্নি মশালকে জাগরুক রাখার জন্য কারাভ্যন্তরে হাংগার ষ্ট্রাইক।

অর্থাৎ ভুক হরতাল করেন। ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ড নির্বাচনে চালিকা শক্তি ছিলেন, ১৯৬২ সনের ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ৬৬’র ৬ ঘোষনার মাধ্যমে স্বাধীকার আন্দোলনকে বেগবান করেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে বাঙালি মহানায়কে পরিণত হয়। ৭১এ মহান মুক্তিযুদ্ধ তার নামেই শুরু ও শেষ হয়। ৭মার্চ একাত্তরের ঘোষনা জাতিকে পথ দেখায়। বাঙলা এখন কেবল একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা নয়, বাংলা এখন আন্তর্জাতিক ভাষা। তাই মহান শহীদ দিবসে জাতি দেশ শ্রদ্ধায় অবণত হয়ে মহান শহীদদের স্মরণ করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here