স্রোত-কাদার সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ

0
25

স্রোত আর কাদার সঙ্গে যুদ্ধ করেই এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। বর্ষা মৌসুমে প্রচণ্ড স্রোতের কারণে পদ্মায় কাজ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নদীর তলদেশে কাদার স্তর ধরা পড়ায় ১৪টি পিলারের নকশা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় কাজের সার্বিক গতি কিছুটা কমলেও হতাশ নন প্রকল্পের কর্মকর্তারা। এ দুই বাধা কাটিয়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে দিন-রাত কাজ করছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক-কর্মচারীরা। সরেজমিন পদ্মা সেতু এলাকা ঘুরে কর্মযজ্ঞ দেখা গেছে।

মাওয়া থেকে ওপারে সাত্তার মাতব্বর লঞ্চঘাট পর্যন্ত সারি সারি নির্মাণ যন্ত্র বসানো। বিভিন্ন আকারের এসব যন্ত্রই প্রতিনিয়ত বুনছে স্বপ্ন। বর্তমানে পুরোপুরি কাজ চলছে ৩৭, ৩৮, ৩৯ ও ৪০নং পিলারের। এগুলোর ঢালাই হয়েছে। এখন ক্যাপ বসানো হচ্ছে। তীব্র স্রোতের কারণে মাঝ নদীতে সামান্য স্থবিরতা থাকলেও ওয়ার্কশপে পুরোদমে কাজ চলছে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে না বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মূল নদীতে স্রোতের কারণে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে কয়েকটি পিলারের কাজ চলছে। এ সময়টাতে সেতুর ডেকিং তৈরির কাজ চলছে ওয়ার্কশপে। তিনি আরও জানান, নদীর নিচে কাদার স্তর দেখা দেয়ায় রি-ডিজাইন করতে বলা হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে এর সমাধান হবে। এখনও আমি আশাবাদী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করা যাবে।’ জানা গেছে, পদ্মা সেতুতে ৪২টি পিলার থাকবে। এর মধ্যে ৪০টিই থাকবে নদীতে। বিদ্যমান নকশায় নদীর প্রতিটি পিলারের জন্য ছয়টি করে পাইল নির্মাণ করতে হবে। নদীর গভীরতাভেদে এগুলোর গভীরতা হবে ৩০০-৪০০ ফুট।

মাওয়া এবং জাজিরায় নদীর পাড়ে দুই পিলারে পাইল হবে দুটি করে। সেতুর প্রতিটি পিলারের জন্য পরীক্ষামূলক পাইলিং শেষ হয়েছে গত বছর। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সয়েল টেস্টে দেখা দেয় বিপত্তি। ১৪টি পিলারের পাইলিংয়ের ৩৮০-৪০০ ফুট গভীরতায় ধরা পড়েছে কাদার স্তর। ফলে পিলারগুলোর নকশা অনুমোদন আটকে যায়। এতে ১৪টি পিলারের কাজও শুরু করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে পাইলিংয়ের ডিজাইন রিভিউয়ে পরামর্শক নিয়োগ করেছে সেতু বিভাগ। কাদার স্তর পাওয়া পিলারগুলো হল : মাওয়ার কাছে ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ এবং জাজিরার কাছে ২৬, ২৭, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৫। পিলারগুলোর জন্য পানির জিরো ডিগ্রি থেকে ১১০-১২০ মিটার গভীর পাইল করতে হবে। কিন্তু কাদার স্তর ধরা পড়ার স্থানে পাইলিং শেষ হলে সেতুর ভার বহন করতে পারবে না। লোড টেস্টে পাইল কাদার ভেতরে দেবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে প্রতিবছর কিছু মাটি সরে যায়। খরস্রোতের কারণে এমনটি হয়। তাই সেতুটির পাইল অনেক গভীর হতে হবে। বিশ্বে কোনো সেতুতে এত গভীর পাইল করতে হয়নি। তবে এখন পাইলের শেষ প্রান্তে কাদা মাটির স্তর ধরা পড়ায় দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। এ জন্য নতুন করে নকশা রিভিউ করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে নিয়োগ দেয়া হয়েছে পদ্মা সেতুর ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। সেতুর ব্যবস্থাপনা পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করছে যুক্তরাজ্যের রেন্ডাল লিমিটেড। এর সঙ্গে রয়েছে জাপানের পাডিকো কেইএল ও বাংলাদেশের বিসিএল। এ তিন প্রতিষ্ঠানই যুগ্মভাবে পদ্মা সেতুর ১৪টি পিলারের ৮৪ পাইলের নকশা পর্যালোচনা করছে। এ ক্ষেত্রে সহায়তা করছে ডেনমার্কের পরামর্শক কাউই। প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব পিলারের নিচে কাদার স্তর দেখা দিয়েছে সেগুলো মাঝ নদীতে পড়েছে। সাধারণত বছরের এই সময়টায় স্রোতের কারণে মাঝ নদীতে কাজ করা যায় না। সুতরাং ১৪টি পিলারের কারণে বাড়তি সময় নষ্ট নাও হতে পারে।

সূত্র জানায়, চলতি মাসে জাজিরার কাছে ৩৭নং পিলারটির ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে ৩৮নং পিলারের কাজ চলছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে ৪২নং পর্যন্ত ছয়টি পিলারের ঢালাই সম্পন্ন হতে পারে। এরপর পিলারগুলোর ওপর স্প্যান বসানো হবে। তাছাড়া পদ্মা সেতুর সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পদ্মার জাজিরা পয়েন্টে চলছে পাইল ড্রাইভ, মাওয়া পারে ট্রাস্ট ফেব্রিকেশন ইয়ার্ডে চলছে স্টিলের কাঠামো ও স্প্যান জোড়া দেয়ার কাজ। পিলারের ওপর গাড়ি চলাচলের জন্য বসানো হবে এই স্প্যানগুলো। মাওয়া চৌরাস্তার দক্ষিণে বিস্তৃত প্রকল্প এলাকার ট্রান্স ফেব্রিকেশন ইয়ার্ডে চলছে প্রায় তিন হাজার টনের একেকটি স্প্যান তৈরির কাজ।

গত জুন পর্যন্ত পদ্মা সেতুর সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া জাজিরা প্রান্তে অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ ৯৯ দশমিক ৫০ শতাংশ, মাওয়া প্রান্তে অ্যাপ্রোচ সড়কের শতভাগ, সার্ভিস এরিয়া-২ শতভাগ, নদীশাসন কাজ ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মূল সেতুর নির্মাণ কাজ ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৬৭৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। গত জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্রকল্পের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় হয়েছে ১৪ হাজার ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৫ হাজার ৫২৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে সেতুটি নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here